Monday, February 16, 2009

স্মৃতির ভেতর স্মৃতির ভেতর স্মৃিত

স্মৃতির ভেতর স্মৃতির ভেতর স্মৃিত

পোড়া ট্রাম, সোডার বোতলের বৃিষ্টপাতের মধ্যে ফুটে ওঠা েপ্রম।
একটা যুগের আত্মকথা লিখছেন শঙ্করলাল ভট্টাচার্য

কালবেলা
সৌমিত্র, পরমব্রত, পাওলি, রুদ্রনীল, শািন্তলাল
সেরা সময়, জঘন্য সময়। জঘন্য সময়ও কি? কথাটা নকশাল পিরিয়ডে আমাদের কলেজ ইউনিভার্সিটির সময়টাকেও বর্ণনা করে। শুধু একটু ব্যতিক্রম: ’৬৭ থেকে ’৭১-এর শেষ অবধি, অদ্ভুত সময়টাকে আমরা বরাবর ‘বেস্ট অব টাইমস’ই ভেবেছি, গভীর সেন্ধতে েপ্রসিডেিন্সতে তারক সেনের ‘কিং লিয়র’ পড়ানো শেষে এলাকা জুড়ে বোমাবাজি এড়িয়ে এড়িয়ে বাড়ি ফেরার সময়ও এই কালবেলাকে ‘ওয়াস্টর্’ বা জঘন্য ঠেকেনি। কারণ তখনও তো সেই দুপুরের স্মৃতি ভর করে আছে আমাদের। কলেজ িষ্ট্রট কফি হাউসে এক দিব্যোন্মাদ কবি বিনয় মজুমদার টেবিলে এসে দিকশূন্য চাউনিতে বলছেন, ‘‘একটা কফি খাব।’’ ও দিকে কয়েক টেবিল দূরে নকশাল নেতা কাকা (অসীম চেট্টাপাধ্যায়), চারু মজুমদারের লাইনের সঙ্গে ওর লাইনের ফারাক বোঝাচ্ছেন সদ্য কলেজে ঢোকা যুবকযুবতীদের, যাদের মধ্যে রূপীয়সী নৃত্যশিল্পী ও বিজ্ঞানছাত্রী লালী হাজির, আর ওরা হা করে ওঁর কথা গিলছে। আর তারই ফাকে নেতাজির বাড়ির ছেলে অমিত বাথরুমের পাইপ বেয়ে চম্পট দিচ্ছে, বিপক্ষের ছেলেরা ওর রক্ত খাবে। আর এত সব বড় ঘটনার একটা জমাটি ব্যাকগ্রাউণ্ড মিউজিকও তো থাকতে হবে— যা হল দমাদ্দম বোমার কেত্তন আর পুলিশের গুলির আখর। সবাই পালাই পালাই করছে আর সঙ্গিনী বললে, ‘‘সে কী কাটলেটটা ফেলে যাবে? বিনয়দার কফিও তো আসেনি।’’

সমরেশ মজুমদারের বহু প্রশংসিত িট্রলজি উপন্যাসের মধ্যখণ্ড অবলম্বনে গৌতম ঘোষের ‘কালবেলা’ ছবি ওঁর ও আমাদের মতো নকশাল, কলেজ িষ্ট্রট, কফি হাউস প্রজেন্মর কাছে স্মৃতির ভেতর স্মৃতির মধ্যে স্মৃতি। আমাদের চিরদিনের রমাপদ চৌধুরীর উপন্যাসের নাম ধরে বলতে হয় ‘এখনই’। ট্রাম পুড়ছে, সোডার বোতলের বৃিষ্টপাত হচ্ছে, সন্দীপন চেট্টাপাধ্যায় শক্তি চেট্টাপাধ্যায়ের সনেটগুচ্ছ নিয়ে মিনিবুক বার করে সংস্কৃত কলেজের রেলিংয়ের সামনে বেচতে বসেছেন— এ সবই যেন এক মায়াময় বাতাবরণ, যা ঘিরে রেখেছে অজস্র টুকরো টুকরো েপ্রমের প্রথম কদম ফুলকে। পাশের টেবিল থেকে সদ্য েপ্রমে পড়া যুবতীর অনুযোগ ভেসে আসে যুবকের প্রতি—‘‘রোজ যে বোমাগুলি ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে কলেজ করতে আসি তা কি এই শুনতে যে মন কেমন করা একটা আদিখ্যেতা?’’ বাড়ি ফেরা আর হয় না। সেন্ধ গড়িয়ে রাত নেমে গেলে শাখারিটোলায় মিন্দর বাড়ির চাতালে বসে বাংলা মদ আর বন্ধুদের আড্ডায় একটি ছেলেকে আরও অন্য, অন্য স্বেপ্নর কথা বলতে শুনি। ও চার পাশের রাজনীতি, েপ্রম কিংবা বিপ্লব, আহার-অনাহার, শোক-দুঃখ-মৃত্যু নিয়ে ছবি করতে চায়। ও তথ্যচিত্র করতে চায়। কাহিনিচিত্র তো একটু একটু করে বড় হচ্ছেই মনের মধ্যে, সময়ে প্রকাশ্য। আেন্দালনের আগুন তখনও সে ভাবে নেভেনি, যখন ছেলেটি ‘হাংরি অটাম’ বলে একটি ছবি করে বসেছে। ক্রমে ‘দখল’ এবং এক সময় ‘পার’। কিন্তু এতটা কাল ধরে যে সময়ের জলজ্যান্ত চরিত্র ও নিজে, সেই সময়ের একটা স্মৃতিকথার অপেক্ষায় ছিলাম ওর বন্ধু, আমরা।

গৌতম ঘোষ কথা রেখেছেন, ‘কালবেলা’ করে, আর আমরা একে শুধু েপ্রম আর রাজনীতির ছবি, শুধু অনিমেষ ও মাধবীলতার ছবি বলে থেমে যেতে চাইব না, এ বাস্তবিক অর্থে এক যুগের আত্মকথা। আর এক সমরেশের (বসু) কাহিনি অবলম্বনে ওঁর ‘পার’ দেখে ওঁকে সত্যজিৎ থেকে তরুণ মজুমদার জমানার পরের পর্বের অগ্রগণ্য চলচ্চিত্রকার বলে চিনেছিলাম, আর ‘কালবেলা’ দেখে ওঁকে সেই সময়কালের সর্বশ্রেষ্ঠ বলে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছে।

ছবিতে সময় ধরতে পর্দায়ও কিছুটা সময়ের দরকার হয়। ‘কালবেলা’ও সময় নিয়েছে দু’ ঘণ্টা পয়তািল্লশ মিনিট। তাতেও যে সাড়ে পাচ ঘণ্টার দশ এপিসোড টেলিসিরিয়াল থেকে সম্পাদনা করে দাড় করানো ছবিটাকে অহেতুক লম্বা মনে হয়নি, তার কারণও ওই সময়। মোটামুটি ’৬৮-’৬৯ থেকে ’৭৭-’৭৮ সালের মধ্যে কলেজপাড়া, রাজনীতি ও জনজীবনের বেশ কিছু পর্বান্তর ধরার চেষ্টা আছে, স্বচ্ছ কারিকুরিহীন, ন্যারেটিভে এই ছবিতে। উত্তরবঙ্গ থেকে কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়তে আসা যুবক অনিমেষের পড়াশোনা থেকে রাজনীতি, ক্রমে রাজনীতি থেকে রাজনীতি, রাজনীতি থেকে েপ্রম, বিন্দদশা, নৈরাজ্য এবং শেষে বিশ্বাসে ফেরা— এই হল ‘কালবেলা’র বেলা-অবেলার বৃত্তান্ত। উপন্যাসের অজস্র সাবপ্লট থেকে ছেঁকে বেছে যে কাহিনি পর্দায় রাখা হয়েছে তা অনবদ্য। মূলত টিভির জন্য তোলা বলে ক্লোজ ও মিডশটে ঘন-ঘনিষ্ঠ বড় করে তোলা হয়েছে নানা পরিিস্থতি। আবার এই অন্তরঙ্গতার সুন্দর ভারসাম্য কলেজ ও ইউনিভার্সিটি, মিছিল, িষ্ট্রট ফাইট ময়দান ও গঙ্গাবক্ষের খোলা দৃশ্য। টিভির লম্বা কাজ বলেই হয়তো একটা নাটকীয় ওঠাপড়া মাঝেমাঝেই কাজ করেছে ছবির ছেন্দ। কিন্তু এই ওঠাপড়া নিয়েই তো নকশাল আেন্দালনকালের ছাত্রজীবন, এই ওঠাপড়া আকবাক নিয়েই সমরেশের যুগনিষ্ঠ উপন্যাস। এই ওঠাপড়ার জন্যই হয়তো ছবিটাকে ঠিক দম এটে দেখতে হয় না; মেসবাড়ি, থানা, ক্লাসরুম, জেল সেল, গলির অন্ধকার থেকে খোলা দৃশ্যের বাতায়নীকরণ খুব সুন্দর বাতাস খেলানোর কাজ করে।

তবে কাহিনির সব চেয়ে সুন্দর হাওয়া বদল হয় অনিমেষ ও মাধবীলতার েপ্রমে। হাওয়ার ঝলক আসে নায়কের মেসের সঙ্গীর কবিতা বলা আর লেখায়। কী করে, কী করেই যে শহরে বাংলা সাহিত্য পড়তে আসা যুবা বামপন্থী রাজনীতিতে ঢুকে পড়ে, ক্রমে সে-রাজনীতিও পরিত্যাগ করে উগ্রপন্থী হয়, তত্ত্ব থেকে তেত্ত্ব সরে সরে গিয়ে, তা ছবি করে দেখানো খুব সহজ কাজ নয়। এক ধরনের সরলীকরণ এসেই যায়, আর যা না এলে ছবিকে জনগ্রাহ্য করা, সেন্সরের কাচি থেকে বাচানো সম্ভব না। ‘কালবেলা’-কে কলকাতার ইতিকথা ও অপরূপ একটা েপ্রমের ছবি করে সেই উত্তরণ ঘটেছে।

‘কালবেলা’র েপ্রম সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে অনিমেষ চরিত্রে পরমব্রত চেট্টাপাধ্যায় ও মাধবীলতা চরিত্রে পাওলি দামের আশ্চর্য এবং প্রায়-নিখুত অভিনয়। বহু দিন পর এত ভাল অভিনয় দেখলাম বাংলা ছবির নায়ক-নায়িকা ভূমিকায়। আর সৌমিত্র চেট্টাপাধ্যায়ের কথা কী বলব! ১৯৫৮ সালের অপু পঞ্চাশ বছর পর অনির দাদু হয়ে সীমিত কিছু সিকোয়েেন্স এত সুন্দর একটা চরিত্র রোপণ করে গেলেন যা সহসা মনে পড়িয়ে দিল মৃণাল সেনের ‘পদাতিক’ ছবিতে অনুরূপ ভূমিকায় বিজন ভট্টাচার্যকে। বাবার চরিত্রে সন্তু মুখোপাধ্যায়, সুভাষদা’র রোলে শািন্তলাল, নীলার ভূমিকায় আনন্দী আর বিশেষ করে কবিচরিত্রে রুদ্রনীলকে দিয়ে দারুণ কাজ করানো গেছে। রুদ্রনীলের চরিত্রটা বড় মনকাড়া, কিন্তু কবি থেকে ওঁর বিপ্লবী হওয়া দেখানোর জন্য আরও কিছু দৃশ্যের দরকার ছিল।

বাংলা ছবিতে এত সুন্দর গানও শুনলাম বহু দিন পর। রেকর্ডে কে এল সায়গলের গলায়, নিজের গলায় আটপৌরে ভাবে পাওলির। গৌতমের ছবিতে চিত্রগ্রহণ বরাবরই সুন্দর, এই ছবিতে ক্যামেরার কাজেও অদ্ভুত সংযম দেখলাম। যা ছবিকে আরও সুন্দর করেছে। গৌতমের পরিচালনার গুণপনার কথায় একটা কথাই শুধু বলার বাকি— উনি এ ছবির নিছকই পরিচালক নন, আক্ষরিক অর্থে এর auteur, অর্থাৎ সর্বময়। এ ছবি ওঁর ‘কলকাতা ৭১’ও।

No comments: