Monday, February 16, 2009

অসাধারণ চকচকে, কিন্তু কোথাও আরও হৃদয় থাকা উচিত ছিল

অসাধারণ চকচকে, কিন্তু কোথাও
আরও হৃদয় থাকা উচিত ছিল

মনে হল শঙ্করলাল ভট্টাচার্য-র

অন্তহীন
অপর্ণা, শর্মিলা, রাহুল, রাধিকা, কল্যাণ
এক কথায়— স্মার্ট! দু’কথায়— দারুণ স্মার্ট! তিন কথায়—একটু বেশি স্মার্ট! অল্প কথায় এই হচ্ছে অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরীর ছবি ‘অন্তহীন’। যার নির্মাণকৌশল সিনেমার বিভিন্ন অঙ্গের দাপট, চকচকে ঝকঝকে নিপুণ পরিবেশন প্রায় বিলিতি ছবির গায়ে গায়ে। বিষয় ভাবনা এই মুহূর্তের খবরের কাগজ থেকে উঠে আসা, তাতে ইন্টারনেট চ্যাটিং-এর নামগোত্রহীন অন্তরঙ্গতা হালফিলের েষ্ট্রস অ্যাণ্ড কনভিনিয়েন্স দাম্পত্যের সহজাত বিপন্নতা, চাকরির চাপ, ব্যক্তির মরা-বাচা— সব ছেড়া-ছেঁড়া, ভাঙা-ভাঙা ভাবে জড়ো হয়েছে এক সিনেমার জন্য লেখা কাহিনিতে, যারও কৃতিত্ব অনিরুদ্ধর। হয়তো সিনেমাকে বড্ড বেশি মাথায় বয়ে বেড়ানোর জন্যই গল্পকে কোথাও কোথাও একটু বেশি সাজিয়ে ফেলা, বাস্তব থেকে বিচ্ছিন্ন করা ঘটে গেছে। বিজ্ঞাপনী চিত্রনির্মাণে হাত পাকানো অনিরুদ্ধর এই সামাজিক কাহিনিচিত্রেও দিব্যি ভর করেছে অ্যাডফিল্ম স্টাইলের পালিশ, প্রসাধন নখরা। তৎসেত্ত্বও ‘অন্তহীন’ কিন্তু বাংলা সিনেমার এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এতটাই যে গৌতম ঘোষের ‘কালবেলা’ দেখার পরে পরেই এ ছবি দেখে মনে হল বাংলা ফিেল্ম বুঝি বা নতুন করে বসেন্তর দোলা লাগল। বনলতা সেনের প্রশ্নটা ওঁকে করাই যেত—‘এত দিন কোথায় ছিলেন?’ করা গেল না, কারণ কিছু দিন আগেই উনি ‘অনুরণন’ করে নিজের আগমনী শুনিয়েছেন।

‘অন্তহীন’ আসলে টুকরো টুকরো কতকগুলো সম্পর্কের ছবি। নায়ক অভীক ডাকসাইটে পুলিশ অফিসার, জীবনের বারো আনা লালবাজারে, গুণ্ডাগার্দি দমনে, অস্ত্রপাচার সামলানোয় বয়ে যায়; বাকি চার আনা বাড়িতে বিধবা পিসি, ইন্টারনেট চ্যাট আর হুইিস্ক নিয়ে। টেরও পায় না টেলিভিশনের যে চুলবুলে যুবতী রিপোর্টারকে ও বাইট দিতে অস্বীকার করেছে, কী করে, কী করেই ও-ই ওর অন্তরঙ্গ, নাম না-জানা চ্যাট-সঙ্গী হয়ে গেছে। িস্ক্রনের মরমি সংলাপ এক সময় ওর দিনগত পাপক্ষয়ের জীবনে সুবাতাস বইয়ে দেয়, ঠিক যেমনটি দেয় রাত-বিরেত হন্যে হয়ে দৌড়ে বেড়ানো রিপোর্টার বৃন্দার জীবনে। চ্যাটের (পড়ুন েপ্রমালাপের) এই মগ্ন মুহূর্তগুলোকে পরিচালক সুন্দর ভরিয়ে তুলেছেন শান্তনু মৈত্রের সুরারোপে অনিন্দ্য ও চিন্দ্রলের কথায় গড়া ‘যাও পাখি’ বা ‘ফেরারি মন’ গোছের বুদ করা আধুনিক গানে।
বলা বাহুল্য, বৃন্দার আলাপচক্রে পড়ে অভীক নিঃসঙ্গ পিসিকে বিশেষ সময় দিতে পারে না, যেমন কিনা ওর দাদা রনোও পারে না বৌদি পারোকে নিয়ে এক ছাদের তলায় থেকে যেতে। রনোরও কাল হয়েছে ইন্টারনেট, যেখানে চ্যাট নয়, ও খোজে শেয়ার রেট, মার্কেট েপ্রাফাইল ইনভেস্টমেন্ট অপশন, পলিসি গাইডেন্স। অবসর মতো ও-ও হুইিস্কতে ভর করে, চুরুট-পাইপের আমোদে বুদ হয়। বইপত্রে ডোবে এবং একাকিেত্বর দর্শন শোনায়। পরিচালক ওরও নির্জনতায় মেজাজ আরোপ করেছেন কাচের বাইরে বৃিষ্ট, বৃিষ্টভেজা শহর ও গানের ব্যাকগ্রাউণ্ড মিউজিক জুড়ে। ওর মাঝে মাঝেই সুযোগ হয়

ব্যাচেলর ভাইকে বিয়ে ও একা থাকার ওপর অ্যাডভাইস করার।

রনোর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যে দিব্যি আছে বা দিব্যি নেই, সেই পারোও হাই েপ্রাফাইল কাজে সারা ক্ষণ হাইহুই হােল্লা হোয়া করে বাড়ি ফিরে হয়তো নিজেকেই খোজে। ওরও নির্ভর পানীয় ও সিগারেটে এবং অপিসে বিশেষ নজর ওর একটি বিশেষ কর্মীর ওপর, যে ঘটনাচক্রে বৃন্দা। এ ভাবে অনেকগুলো মানুষ একে অন্যের আশেপাশে ঘোরে, কিন্তু কোনও সম্পর্কেরই যেন বৃত্ত সম্পূর্ণ হয় না। সবাই একেকটা ট্যানজেন্ট বা স্পর্শরেখার মতো ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্যে ছুটে যায়।

ছড়ানো-ছিটানো এত সব এপিসোডের মধ্যে একটা সম্পর্কই দর্শককে বশ করে, একটা পরিণতির আভাস দেয়— অভীক ও বৃন্দার ইন্টারনেট েপ্রম। ‘অন্তহীন’-এর এই প্লটটা ধরে রাখতে অনিরুদ্ধ বেশ এক িথ্রলার-ছক কষেছেন ছবিতে, আর সেই িথ্রল ও রহস্যকে ছড়ানোর জন্য একটা রিয়েল এেস্টট ও কনষ্ট্রাকশন মাফিয়ার অবতারণা করেছেন। খুব যে জেম্পশ ভাবে প্লটটা বেধেছেন তা নয়, তবে অভীক ও বৃন্দার এপিসোডে এই বৃত্তান্তই শেষ কথা বলে। একটা সুন্দর সম্পর্কে ইতি টেনে দেয়। অভীক ও বৃন্দার ভূমিকায় রাহুল বসু ও রাধিকা আেপ্তর অপূর্ব অভিনয়ই এই পিচকার পারফেক্ট, নিটোল দৃশ্যাবলিতে ভরানো ছবিতে কিছু হাসি, কিছু বেদনা জোগায়। নচেৎ অভীক মুখোপাধ্যায়ের দুর্ধর্ষ ক্যামেরার কাজ এতই মধুর ও পরিপাটি করে তুলেছে সব কিছুকে যে স্থান, কাল ব্যক্তি ও সমস্যার বাস্তবতা হারিয়ে যায়। কাহিনির সব চরিত্রই এত পাচতারা পরিবেশে বসবাস করে, কারও পরিবেশেই পান থেকে চুন খসে না, নায়ক-নায়িকা বাদ দিলে সবাই এত বাধা বুলিকে সংলাপ হিসেবে ছোড়ে যে একটা সময় ‘অন্তহীন’ কিছুটা ক্লািন্তও বয়ে আনে। আর তা যে শেষমেশ আমাদের পেয়ে বসে না তার কারণ রাহুল ও রাধিকার চমৎকার শরীরী ভাষা ও অভিনয়।

বাংলা অভিনয়ে শর্মিলা ঠাকুরের একটু জড়তাই প্রকট হল, বাঙালি বৃদ্ধাদের কথার মসৃণ চাল ওর এল না। উপরন্তু চিত্রনাট্যকার ওর টেলিফোনের েপ্রমিকের যে-গল্প ওকে দিয়ে বলালেন তা বহু আগে থেকেই ক্লিশে। পারো চরিত্রে অভিনয় করলেন অপর্ণা সেন, না পারোই ঢুকে পড়ল অপর্ণা সেন চরিত্রে — এই ধন্ধও তৈরি হয়েছে দর্শকমনে। টিভি ও পত্রপত্রিকার দাক্ষিণ্যে বহু প্রচারিত অপর্ণার জীবনচিত্র বাঙালির কাছে খুবই পরিচিত তার চলনবলন, ভাবভঙ্গি, ম্যানারিজম-সহ ছবিতে সেই persona চরিত্রের অবিকল বিস্তার নজরে এল। যেন িস্ক্রপ্টও তৈরি হয়েছে অভিনেত্রীর
জীবনের আদলে। ফলে পারো কী হতে পারত আমরা জানি না, আমরা অপর্ণা সেনকে দেখলাম। তবে যা পেলাম তাও কম না।

সে দিক দিয়ে কল্যাণ রায় একটা নতুন হওয়া। তিনিও হয়তো নিজের মতো একটা চরিত্রেই অভিনয় করছেন (ওঁদের দেওয়া সাক্ষাৎকারেও তো এমনই আভাস মিলেছে) কিন্তু ওঁর দুঃখের হাসি, ঠাট্টা জড়ানো উপদেশের ভঙ্গি, একাকিত্ব হজম করার মসৃণ মুখভাব খুবই শ্লাঘনীয় কাজ। ভাল লেগেছে ছবির ভিলেন মেহরার স্ত্রীর রোলে মিতা বশিেষ্ঠর অভিনয়। সংযত এবং বাস্তব।

ছবির এত অঙ্গে এত রূপ থেকেও ‘অন্তহীন’ যে শেষ অবধি খুব গভীর রেখাপাত করে না তার কারণ গভীরে যাওয়ার তেমন তাড়না হয়তো অনিরুদ্ধর ছিল না। একটা স্টাইলিশ ন্যারেটিভে আজকের কিছু চরিত্র নিয়ে খেলাধুলার ইচ্ছে ছিল। যদি তা-ই ওঁর লক্ষ্য থেকে থাকে, তা হলে উনি সাড়ে তেরো আনা সফল। যদি বাংলা ছবির ভুলভ্রািন্ত, হাতুড়েপনার বিরুেদ্ধ একটা রব তুলতে চেয়ে থাকেন, তা হলে তাতেও চোেদ্দা আনা সার্থক। তবে জানতে ইচ্ছে করে যে জীবনানেন্দর স্মরণীয় পঙক্তি ‘পৃথিবীতে নাই কোনও বিশুদ্ধ চাকুরি’ পারোর মুখে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বলে চালানো কি নেহাতই ইচ্ছাকৃত (পারোকে কিছুটা foppish দেখানো) নাকি ইউনিটের সেম্মলক বিভ্রািন্ত? জানতে ইচ্ছে করে বহুতল ইমারত নির্মাতারা কি টিভির কোনও কিিঞ্চদধিক কৌতূহলী প্রতিবেদককে এতটাই ডরায় যে সাবড়ে দিতে পিছপা নয়?

আর সেই বা কেমন টিভি প্রতিবেদক, যার কোনও ক্যামেরাসঙ্গীর প্রয়োজন হয় না, যন্ত্র বলতে একটা ডিক্টাফোন?

শেষে ফিরে যেতেই হবে ছবির কারিগরি নৈপুণ্যের কথায়। বাংলা গানের সঙ্গে জগজিৎ সিংহ কী রাশিদ খান মিশিয়ে এক সুন্দর সাংগীতিক মোজেক সৃিষ্ট করেছেন শান্তনু। ‘পরিণীতা’র সুরকারের এই কাজ— কথা, সুর, মোজেকের নিপুণ অন্বয়ে গড়া— ছবির অনেক সংলাপ অনেক মনস্তেত্ত্বর চিত্র ভাবা হয়েছে, ধুরন্ধর ক্যামেরা, সাউণ্ড, সেট ও এডিটিং-এ ঝা-চকচকে ‘অন্তহীন’ ছবি তৈরির এক নতুন মাত্রা হয়তো। তবে লক্ষণীয় এও, প্রতিটি বিভাগ নিজের নিজের মতো করে চমৎকার হয়েও শেষ অবধি ছবির gloss জমকই বাড়ায়। কাহিনি, চিত্রনাট্য ও পরিচালনার দায়িেত্ব থাকা অনিরুদ্ধকে অতিরিক্ত বিনোদনে অবরুদ্ধ রাখে।

দৃশ্যে দৃশ্যে ব্র্যাণ্ডনেমের প্রতিভাস যেমন থেকে থেকেই মনে পড়িয়ে দেয় যে, তিনি বিজ্ঞাপনী চিত্রকর্মের কেউকেটা।

1 comment:

নাজমুল হাসান said...

জটিল লিখেছেন। গতকাল মুভিটা দেখার পরে ঠিক সেই অনুভুতিই কাজ করেছে.. খুব বেশী ভিতরে প্রবেশ করতে পারিনি তো! পরিচালক ও কি খুব ভেতরে যাবার চেষ্টা করেছেন? জানি না, তবে কাহিনী বিন্যাস আর ছবির ফ্রেমিং, সাথে আলোর লুকোচুরি - সব মিলিয়ে বেশ ভালোই লেগেছে।

আমার ব্লগসাইট টি একবার ঘুরে গেলে ভালো লাগবে!
darashiko.info
ধন্যবাদ