Monday, February 16, 2009

লজ্জা লাগছে রাগও হচ্ছে

লজ্জা লাগছে রাগও হচ্ছে

লিখছেন পরমব্রত চেট্টাপাধ্যায়

খুব খারাপ লাগছে। রাগ হচ্ছে। আবার লজ্জাও করছে। ড্যানি বয়েলের ‘স্লামডগ
মিলিওনেয়ার’ দেখার পর এটাই আমার প্রাথমিক রিঅ্যাকশন।

ছবি হিসেবে কিন্তু দুরন্ত। কোনও সেন্দহ নেই। যেটা খারাপ লেগেছে, সেটা হল ছবির পলিটিক্সখানা।

মুম্বইয়ের বিস্ততে জন্মানো একটি মুসলমান ছেলে, অকথ্য সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে বড় হয়ে, তার প্রাত্যহিক জীবন থেকে অর্জন করা জ্ঞানের সাহায্যে শেষমেশ জিতে নেয় ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’র মতো একটি প্রতিযোগিতা... একটি রূপকথা, যেখানে নায়কের পথে আসে বঞ্চনা, লাঞ্ছনা, অত্যাচার, েপ্রম... কিন্তু শেষমেশ জয় হয় তার। কীসের হাত ধরে? ঠিক ধরেছেন, টাকার হাত ধরে, পুজির হাত ধরে। ব্যাস! আর কী চাই? দেশের আমজনতা, আর বিদেশ বিভুইয়ে খুটে খাওয়ার চেষ্টা করতে থাকা এশিয়ান আমেরিকান, বা এশিয়ান ইউরোপিয়ানদের মনের কথা তো এক লহমায় বলা হয়ে গেল! আর এই রূপকথা বলার অছিলায়— দারিদ্র, ভারতের সব থেকে বড় শহরের ‘তলা’টা, তার ঘিিঞ্জ গলি, অমানবিক পরিবেশে মানুষের বসবাস, যা যা সিনেমায় মনোহারি লাগে, স-অ-ব, ডিটেলে দেখানো গেল! গ্লোবালাইজেশন-উত্তর ভারতের আদত চেহারা।

রাগ হল তো? মনে হল তো: আমাদের দেশ মানে কি শুধুই এই সব নাকি? এ তো এক জন ইংরেজের চোখে দেখা ভারত!

তবু সত্যটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই। যতই খারাপ লাগুক, চার পাশের চোখ-ধাধানো ঝিলমিলগুলো পেরিয়ে একটু বড় করে চোখ মেলে তাকালেই চোখে পড়বে এই বাস্তবতা। মুম্বই অবধি যেতে হবে না... কাছেই, কলকাতার জগন্নাথ ঘাটে গিয়ে কিছু ক্ষণ বসলেই বা পার্কসার্কাসের মোড়ে যে বাচ্চাগুলো ভিক্ষা করে, তাদের ঘৃণাভরে অবজ্ঞা না করে, ভাষাটা কান পেতে শুনলেই ভেতরে ভেতরে শিউরে উঠতে হবে।

অস্বীকার করতে পারি কি দায়টাও? আমাদের দেশটাকে দিন-দিন আরও বড় বাজার করে তোলার চেষ্টায় ইন্ধন জোগানোর দায়? ড্যানি বয়েলের দৃিষ্টভঙ্গি হয়তো কিছুটা একমাত্রিক, কিন্তু সেই সব ছবি করিয়েরা, যারা খোদ এই দেশে বসে ছবি বানাচ্ছেন? তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েনের গেল্পর মধ্যে, বা দেশ-বিদেশে চিত্রায়িত এনআরআই— সবই তো ফ্যামিলি ড্রামার মধ্যে। কোথাও তাদের বাসভূমির বাস্তবতার চিহ্নমাত্র নেই। ‘কভি খুশি, কভি গম’-এর মধ্যে এই সময়ের ভারতের বাস্তবতা আছে কি?

আর সেই সুযোগে সেই কাজটা করে যাচ্ছেন এক জন ইংরেজ।

আসলে ‘স্লামডগ মিলিওনেয়ার’ ঠিক সেই বিষয় নিয়েই কথা বলেছে, ভারত সম্বেন্ধ যেটা শুনতে ভালবাসবে পিশ্চমী দেশগুলো। একশো বছর আগে অ্যাল্ডাস হাক্সলির কাছে ভারত ছিল সাপুড়ে, রাজারাজড়া আর সন্ন্যাসীদের দেশ। আর এখন ড্যানি বয়েলের কাছে তা হল বিস্তর পাশে শপিং মলওয়ালা চরম বৈপরীত্যের দেশ। আমাদের অন্যান্য বাস্তবগুলো— যে বাস্তবগুলো প্রায় তাদের কাছাকাছি, সেগুলোর মুখোমুখি দাড়াতে যে তাদের প্রবল অনীহা। ঠিক সেই কারণেই ভারতীয় েপ্রক্ষাপটে তৈরি দু’টি ছবির মধ্যে থেকে ‘তারে জমিন পর’কে ছিটকে যেতে হয়, আর এগিয়ে যায় ‘স্লামডগ মিলিওনেয়ার’। ডিেস্লিক্সয়ার রুগি একটি ভারতীয় বাচ্চা ছেলের দুঃখ-কষ্ট কী করেই বা ভারতের সৌভাগ্যকামী পিশ্চমী দেশগুলোকে উত্তেজিত করবে? এমন ঘটনা যে বড় বেশি রকম ভাবে তাদের রান্নাঘরেও ঘটে। তার থেকে ‘স্লামডগ মিলিওনেয়ার’ ভাল। সহজ ভাবে বলতে গেলে এই ভারতটা পিশ্চমের চেনা ভারত। ‘কমফর্ট লেভেল’টা অনেক বেশি।

ছবির গুণগত মান নিয়ে কিছু বলার নেই। এক কথায় ‘িব্রলিয়ান্ট’। তবে একটা কথা না বলে পারছি না যে, এই ছবি ক’টা অস্কার পাবে, বা আদৌ অস্কার পাবে কি না তা নিয়ে বলিউডের হ্যাংলামোর কোনও কারণ দেখি না, এটা কখনওই একটি ভারতীয় ছবি নয়। এটি একটি িব্রটিশ ছবি, যেখানে ভারতীয় বাস্তবতা এবং কলাকুশলীদের ব্যবহার করা হয়েছে ছবির েপ্রক্ষাপটের স্বার্থে। আর ইতিহাস সাক্ষী যে, ‘স্লামডগ’-এর থেকে অনেক ভাল ছবিও বহু বার অস্কার দৌড়ে পরাজিত হয়েছে। তবে এখন যদি অ্যাকাডেমি অব মোশন পিকচার্স আমেরিকা ঠিক করে যে, সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা এই উপমহাদেশের মানুষের এবং ভারত নামক এই বিপুল বাজারকে আরও ভাল করে কব্জা করতে ‘স্লামডগ মিলিওনেয়ার’ই তাদের তুরুপের তাস, তা হলে তো আর কোনও কথাই চলে না... কর্তার ইচ্ছেয় কর্ম কিনা।

No comments: